ক্বলবের পরিচয় ও প্রকৃতি

 

ক্বলবের পরিচয় প্রকৃতি

রাসূল সা. বলেন,

اَلَا وَاِنَّ  فِي الْجَسَدِ مُضْغَة  اِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ  الْجَسَدُ كُلُّه  وَاِذَا فَسَدَتْ  فَسَدَ  الْجَسَدُ  كُلُّه  اَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ

অর্থ:- জেনে রাখ, শরীরের মধ্যে অবশ্যই একটি গোশতের টুকরা (মুদগাহ) আছে, তা যখন সুস্থ থাকে, গোটা শরীরও সুস্থ থাকে আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরও খারাপ হয়ে যায়

 জেনে রাখ, সেটিই হল কলব

 (বুখারী- হাদীস নং ৫০, ইফাবা)

অত্র হাদীস থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, মানব দেহের মধ্যে একটুকরা গোশ্ত আছে, সেটার সুস্থতা বা অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে তার চিন্তা-চেতনা বা কর্ম-কাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে ক্বলব সুস্থ থাকলে মানব জীবনের সকল কর্ম-কাণ্ড সঠিকভাবে পরিচালিত হয়ে থাকে, আর ক্বলব অসুস্থ হলে তখন মানব জীবনের কোনো কর্ম-কাণ্ডই সঠিকভাবে পরিচালিত হয় না

 হারাম সন্দেহজনক কার্যাবলি পরিহার করতে চাইলে সর্বপ্রথম নিজ আকল বা বিবেককে যথার্থরূপে সুষ্ঠ ঠিক করতে হবে কারণ, মানুষের বিবেকই মানব দেহরুপী কারখানার জন্য চালক মানবের কর্তব্য হলো তার বিবেক-বুদ্ধিকে সুষ্ঠ করা, তারপর সেই সুষ্ঠ জ্ঞানের দ্বারা স্বীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পরিচালিত করা

শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ রহ. বলেন, ‘ক্বলব সকল কিছুর মূল। যেমনিভাবে আবু হুরায়রাহ রা. বলেন, ক্বলব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাদশা আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার সেনাবাহিনী। বাদশা ভাল লে তার সেনাবাহিনী ভাল হয়। আর সেনাবাহিনী তখনই খারাপ হবে যখন বাদশা খারাপ হয়ে যাবে

(আদ-দুরূসুর রামযানিয়্যাহ, পৃঃ ১৭২)

 সুতরাং ক্বলবের পরিশুদ্ধতা সম্পর্কে জানা আমাদের জন্য আবশ্যক

v    ক্বলবের পরিচয়:-

ক্বলব আরবী শব্দ, যার বাংলা অর্থ হলো- মন;প্রাণ, হ্রদয়, অন্ত:করণ;চিত্ত, বুক, বক্ষস্থল, দিল, আকল;জ্ঞান-বুদ্ধি  ইত্যাদি  ইংরেজিতে বলা হয়  Heart

Ø কুরআনে ক্বলব শব্দের ব্যবহার:- কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে ক্বলব শব্দের ব্যবহার এসেছে

           যেমন:- 

     اَلتَّحْوِيْلُপরিবর্তন

                 আল্লাহ তায়ালা বলেন,

                      وَقَلَّبُوْا  لَكَ  الْاُمُوْرَ   

                    তারা আপনার বহু কাজকে ওলটপালট করেছিল

                      (সূরা আত তাওবাহ, আয়াত নং ৪৮)

    ২اَلْبَحْثُ  وَ النَّظْرُ গবেষণা করা দৃষ্টিভঙ্গি

                  আল্লাহ তায়ালা বলেন,

                        فَلَا يَغْرُرْكَ   تَقَلُّبُهُمْ  فِي الْبِلَادِ  

                অতএব আপনাকে যেন বিভ্রান্ত না করে বিভিন্ন দেশে তাদের বিচরণ

                           (সূরা আল-মুমিন, আয়াত নং ০৪)

      )    দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং কর্মে সিদ্ধহস্ত;

                আল্লাহ তায়ালা বলেন,

                         تتقلبوا  فيه  القلوب  ولابصار  

              যেদিন অনেক অন্তর দৃষ্টি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে

                           ( সূরা আন-নূর, আয়াত নং ৩৭)

Ø হাদীসে ক্বলব শব্দের ব্যবহার অনেক লক্ষ্য করা যায়-

              যেমন- রাসূল সা. বলেন,

,  يَا  مُقَلِّبَ  الْقُلُوْبِ  ثَبِّتْ  قُلُوْبَنَا  عَلي  طَاعَتِكَ   وَ يَا  مُصَرِّفَ  الْقُلُوْبِ  صَرِّفْ  قُلُوْبَنَا    اِلي  دِيْنِكَ

হে ক্বলবসমূহের পরিবর্তনকারী! আমাদের ক্বলবগুলো তোমার আনুগত্যে অবিচল রাখ আর হে ক্বলবসমূহের রূপান্তরকারী! আমাদের কলবসমূহ তোমার দ্বীনের দিকে পরিবর্তন কর   

v      প্রকারভেদ:-

                 ক্বলব তিনপ্রকার

          যথা-

     সুস্থ ক্বলব (قلب سليم) : এমন ক্বলবধারী ব্যক্তি মানব বিরোধী সকল ত্রুটি (শিরক,কুফর,নিফাক,হিংসা ইত্যাদি) থেকে মুক্ত থাকবে

    ক্বিয়ামাতের দিন সুস্থ ক্বলব ব্যতীত কেউই মুক্তি পাবে না।

               আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَوْمَ لاَ يَنْفَعُ مَالٌ وَلاَ بَنُوْنَ- إِلاَّ مَنْ أَتَى اللهَ بِقَلْبٍ سَلِيْمٍ

 ‘ক্বিয়ামতের দিন কোন অর্থ-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি কারো কোন উপকারে আসবে না। একমাত্র সে ব্যক্তি মুক্তি পাবে, যে সুস্থ ক্বলব নিয়ে আল্লাহর কাছে পৌঁছবে

          ‘    ‘(সূরা শুআরা, আয়াত নং ৮৮-৮৯)

Ø সুস্থ ক্বলব অর্জনের জন্য পাঁচটি বিষয় থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

            যথা-

          ক) তাওহীদ বিরোধী শিরক তে মুক্ত তে হবে।

          খ) সুন্নাত বিরোধী বিদআত তে

          গ) আল্লাহর নির্দেশ বিরোধী কামনা-বাসনা তে।

          ঘ) আল্লাহর যিকর বিরোধী অলসতা তে।

          ঙ) ইখলাছ বিরোধী কুপ্রবৃত্তি তে।

      অসুস্থ ক্বলব (قلب سقيم) : শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রতঙ্গের মত ক্বলবেরও রোগ হয় আর এরোগ প্রতিকারের উপায় হলো আল্লাহর স্মরণ বেশি বেশি করা এক্বলবের বৈশিষ্ট্য হলো ভালো-মন্দ দুটোই তার কাছে ভালো লাগে কুরআন  শ্রবণে অন্তর প্রশান্ত হয় আবার গান-বাজনা শ্রবণেও অন্তর প্রশান্ত হয়! তবে মন্দ গুণগুলো দ্বারা অন্তর পরিপূর্ণ থাকে

নাফরমানীর কাজ বেশি পরিমাণে করতে করতে এক সময় অন্যায় পথেই ধাবিত হতে থাকে

আল্লাহ তাআলা বলেন,

فِيْ قُلُوْبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَهُمُ اللهُ مَرَضاً

তাদের অন্তকরণ ব্যাধিগ্রস্ত আর আল্লাহ তাদের ব্যাধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন

                    (সূরা বাক্বারাহ, আয়াত নং ১০)

 মূলতঃ এটা মুনাফিকের ক্বলবেরই নামান্তর। কারণ এটা সন্দেহের রোগ। আর মুনাফিকদের অন্তরেই সন্দেহ, সংশয়, অবিশ্বাস বিরাট আকারে দানা বাধে।

   হাদীসে সুস্থ ও অসুস্থ ক্বলবের সুন্দর উদাহরণ দেয়া হয়েছে।

      রাসূলুল্লাহ সা. বলেন,

تُعْرَضُ الْفِتَنُ عَلَى الْقُلُوْبِ كَعَرَضِ الْحَصِيْرِ عُوْدًا فَأَىُّ قَلْبٍ أُشْرِبَهَا نُكِتَتْ فِيْهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ، وَأَىُّ قَلْبٍ أَنْكَرَهَا نُكِتَتْ فِيْهِ نُكْتَةٌ بَيْضَاءُ حَتَّى تَعُوْدَ الْقُلُوْبُ عَلَى قَلْبَيْنِ، قَلْبٌ أَسْوَدُ مُرْبَادًّا كَالْكُوْزِ مُجَخِّيًا- لاَيَعْرِفُ مَعْرُوْفًا وَلاَيُنْكِرُ مُنْكَرًا إِلاَّ مَا أُشْرِبَ مِنْ هَوَاهُ، وَقَلْبٌ أَبْيَضُ، لاَ تَضُرُّهُ فِتْنَهٌ مَادَامَتِ السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ.

চাটাই বুননের মত এক এক করে ফিতনা মানুষের ক্বলবে আসতে থাকে। যে ক্বলবে তা গেঁথে যায় তাতে একটি করে কালো দাগ পড়ে। আর যে ক্বলব তা প্রত্যাখ্যান করে তাতে একটি করে শুভ্রোজ্জ্বল চিহ্ন পড়ে। এমনি করে দুটি ক্বলব দুধরনের হয়ে যায়। একটি উল্টানো কালো কলসির ন্যায় হয়ে যায়। প্রবৃত্তি তার মধ্যে যা গেঁথে দেয় তা ব্যতীত ভালমন্দ কিছুই চিনে না। আর অপরটি শ্বেত পাথরের ন্যায়; আসমান যমীনের স্থায়িত্ব যতদিন ততদিন কোন ফিতনা তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না

          (মুসলিম (ঢাকা : ইফাবা, ২য় মুদ্রণ ১৯৯২ইং) /২১৭ পৃঃ; মিশকাত হা/৫৩৮০ ফিতান অধ্যায়)

পরিত্রাণের উপায়: এ অবস্থা থেকে বাঁচার জন্য কুরআন হাদীসে বর্ণিত দোআর মাধ্যমে প্রার্থনা করতে হবে

 কুরআন মাজিদে এসেছে,

আল্লাহর বাণী

رَبَّنَا لاَ تُزِغْ قُلُوْبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ.

 ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাদের পথ-প্রদর্শনের পর আমাদের অন্তরসমূহ বক্র করবেন না এবং আমাদেরকে আপনার নিকট তে করুণা প্রদান করুন, নিশ্চয়ই আপনি প্রচুর প্রদানকারী

             (সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং )

রাসূল সা. বলতেন

, يَامُقَلِّبَ الْقُلُوْبِ ثَبِّتْ قَلْبِىْ عَلَى دِيْنِكَ

হে অন্তর সমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর স্থির রাখুন

(তিরমিযী হা/২১৪০, ৩৫২২; ইবনু মাজাহ হা/৩৮৩৪, হাদীছ ছহীহ)

মৃত ক্বলব (قلب ميت) : এটা জীবিত ক্বলবের বিপরীত মৃত ক্বলব দ্বারা ব্যক্তি ভালো-মন্দ কিছুই চিন্তা করতে পারে না অনুভূতিশূণ্য ক্বলব হেদায়াতপ্রাপ্ত হবে না এর আবাস্থল হবে জাহান্নাম

 আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيْراً مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ لَهُمْ قُلُوْبٌ لاَّ يَفْقَهُوْنَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لاَّ يُبْصِرُوْنَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لاَّ يَسْمَعُوْنَ بِهَا أُوْلَـئِكَ كَالأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُوْلَـئِكَ هُمُ الْغَافِلُوْنَ-

আর আমি সৃষ্টি করেছি জাহান্নামের জন্য বহু জিন মানুষ। তাদের ক্বলব রয়েছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা অনুধাবন করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তা দিয়ে দেখে না, কান রয়েছে তা দিয়ে শুনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তার চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই গাফেল শৈথিল্যপরায়ণ

            (সূরা রাফ, আয়াত নং ১৭৯)

তিনি আরো বলেন,

, صُمٌّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لاَ يَعْقِلُوْنَ

তারা বধির, মূক, অন্ধ, সুতরাং তারা বুঝে না

           (সূরা বাক্বারাহ, আয়াত নং ১৭১)

 তিনি আরো বলেন,

أَفَلَمْ يَسِيْرُوْا فِي الْأَرْضِ فَتَكُوْنَ لَهُمْ قُلُوْبٌ يَعْقِلُوْنَ بِهَا أَوْ آذَانٌ يَسْمَعُوْنَ بِهَا فَإِنَّهَا لاَ تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِن تَعْمَى الْقُلُوْبُ الَّتِيْ فِي الصُّدُوْر.

তারা কি এই উদ্দেশ্যে দেশ ভ্রমণ করেনি, যাতে তারা বুঝদার হৃদয় (ক্বলব) শ্রবণশক্তি সম্পন্ন কর্ণের অধিকারী তে পারে? বস্তুতঃ চক্ষুতো অন্ধ হয় না কিন্তু বক্ষস্থিত ক্বলবই অন্ধ হয়

(সূরা হজ্জ, আয়াত নং ৪৬)

ক্বলবকে জীবিত করার জন্য বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করতে হবে কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে হবে এবং ইস্তেগফার পড়তে হবে সৎ সঙ্গগ্রহণ করতে হবে

 আল্লাহ তায়ালা আমাদের ক্বলবকে ক্বলবে সালিম হিসেবে গ্রহণ করুন

  আমিন

 

  সংকলনে,

  এইচ,এম, হুজ্জাতুল্লাহ

বি.এ অনার্স, এম.এ মাস্টার্স

(আল-হাদীস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ)

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

 

No comments

Powered by Blogger.